সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়লাখনি থেকে ২০৩০ সালের মধ্যেই প্রায় ৩০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সম্প্রতি এ তথ্য দিয়েছে গ্লোবাল এনার্জি মনিটর (জিইএম)। দ্য গার্ডিয়ান।
এখনো বিশ্বের জ্বালানি ব্যবস্থায় কয়লার বড় একটি হিস্যা ধরে রয়েছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে পরিত্যক্ত খনিও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে জিইএম।
জিইএমের প্রথমবার করা এ গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ সালের পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ৩১২টি কয়লাখনি বন্ধ হয়ে গেছে। চলতি দশকের শেষ নাগাদ আরো ১৩৪টি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ খনিগুলো মোট ৫ হাজার ৮২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত, যা প্রায় ফিলিস্তিনের আয়তনের সমান।
সাধারণত স্ট্রিপ মাইনিং পদ্ধতিতে ভূমির ওপরের স্তরের মাটি বা টপসয়েল ও উদ্ভিদ সরিয়ে ফেলে খনিজ পদার্থ উত্তোলন করা হয়। এ পদ্ধতির গ্রহণের ফলে বিশাল এলাকা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এতে মাটি উর্বরতা হারায়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হয় এবং পরিবেশ দূষিত হয়। জিইএমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের মৃতপ্রায় ও ধ্বংসপ্রাপ্ত জায়গায় যদি সৌর প্যানেল বসানো এবং জ্বালানি উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়, তাহলে সেখান থেকে এত বিদ্যুৎ উৎপন্ন হতে পারে, যা জার্মানির মতো বড় ও বিদ্যুৎনির্ভর দেশের চাহিদাও মেটাতে পারবে।
জিইএমের এনার্জি ট্রানজিশন ট্র্যাকারের প্রকল্প ব্যবস্থাপক চেং চেং উ বলেন, ‘অতীত উত্তরাধিকার সূত্রে মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়লা। কিন্তু সেটিই ভবিষ্যতের রূপরেখা হতে হবে, এমন নয়। কয়লাখনি থেকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের মতো প্রধান কয়লা উৎপাদনকারী দেশগুলোয় কাজে লাগানো সম্ভব। এতে একই সঙ্গে খনি পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে জমির পুনর্বাসন, স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিষ্কার শক্তির উৎপাদন সম্ভব।’
একসময় কয়লাকে মাটির নিচে জমে থাকা সূর্যালোক বলে প্রশংসা করা হতো। তবে এখন কার্বন নিঃসরণের অন্যতম বড় উৎস হওয়ায় বিশ্বজুড়ে এর ব্যবহার কমছে। অন্যদিকে সৌরশক্তি এখন অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য।
জিইএমের মতে, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী মোট ৫৯৯ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমানে দুই হাজার গিগাওয়াটের বেশি ক্ষমতার সৌর প্রকল্প নির্মাণাধীন আছে। বিশ্বজুড়ে মোট সৌরশক্তি স্থাপনের পরিমাণ এখন দুই টেরাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।
তবে পর্যাপ্ত সৌর প্যানেল স্থাপনে ভূমি ব্যবহার নিয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। কৃষিকাজ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবাদী পক্ষসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে এরই মধ্যে আপত্তি তুলেছে। জিইএম বলছে, পরিত্যক্ত কয়লাখনি এ সমস্যা অনেকাংশে সমাধান করতে পারে। কারণ এ এলাকাগুলোর ৯৬ শতাংশই বিদ্যুৎ গ্রিডের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। এছাড়া আশির দশকে যারা কয়লাখনিতে কাজ করতেন তাদের নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।
প্রকল্পগুলো ২ লাখ ৫৯ হাজার ৭০০টি স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং ৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০০টি অস্থায়ী ও নির্মাণসংক্রান্ত কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে, যা ২০৩৫ সালের মধ্যে কয়লা শিল্পে হারানো শ্রমসংখ্যার তুলনায় বেশি।
গবেষণা সংস্থাটির সহযোগী পরিচালক রায়ান ড্রিসকেল টেট বলেন, ‘যখন কোনো কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যায়, শ্রমিকদের ছাঁটাই করে কয়লা খনিনির্ভর অঞ্চলগুলোয় কী ঘটে আমরা দেখেছি। তারা পেছনে রেখে যায় ধ্বংস ও বিশৃঙ্খলা। কিন্তু পরিত্যক্ত কয়লাখনিগুলোয় রয়েছে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ভবিষ্যতের বিশাল সম্ভাবনা।’
তিনি আরো জানান, এরই মধ্যে পরিবর্তনের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এখন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে দরকার শুধু সঠিক প্রণোদনা।